মুর্শিদাবাদের মোরগ্রামের নাম তো অনেকেই শুনে থাকবেন। সেই মোরগ্রাম থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে একটা মিষ্টি গ্রাম আছে - ধলসা। যাওয়া আসার পথে সময় পেলে কোন একদিন চলে আসুন সেই গ্রামে। সেই গ্রামের ক্লাব ধলসা যুব সম্মেলনী ক্লাবের (Dhalsa Yuva Sammelani Club) উদ্যোগে প্রায় 245 টি পরিবারকে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ :
আগে ধলসা গ্রামের সঙ্গে একটু পরিচয় হলেই আপনাদের ভালো লাগবে আশা করি। ধলসা গ্রাম জন বৈচিত্রের সমাবেশের এক মিলন স্থল। সাগরদিঘী থানার বোখরা-1নং গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত। গ্রামে আনুমানিক 1550 জন ভোটার, 350 টি পরিবারের বসবাস। আদিবাসী পাড়া, হিন্দুপাড়া এবং মুসলিম পাড়ার সমবেত মানুষের সহাবস্থান নিয়েই সম্পূর্ণ ধলসা। যেন এক সম্পূর্ণ ভারত। আজীবন কাল থেকে দেখে আসছি এই তিন শ্রেণীর পারস্পারিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন। উৎসব-পার্বণে, খেলাধুলায়, চাষাবাদে , জল ঝড়ে ,খরা বর্ষায় গ্রামের মানুষের একত্র জীবন লড়াই। বর্তমান দেশে কালের হাওয়ায় সেই সুরে ছন্দপতন ঘটলেও গ্রামকে এখনো গ্রাস করতে পারেনি। আজও মাঠের ক্ষেত কিংবা পাড়ার টং জাতি নির্বিশেষে আড্ডার জৌলুসে সুদৃশ্য শেকড়ের সন্ধান মিলিয়ে দেয়। আর তারই প্রমাণ আকস্মিক দুর্যোগের সময় অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানো।
দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ধলসা গ্রামের 222টি দুঃস্থ পরিবার এবং পার্শ্ববর্তী পানিয়া গ্রামের 23টি পরিবারকে নিম্নলিখিত নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দিল ক্লাবের উদ্যোগী যুবকরা..
1.চাল-4 কেজি
2. আলু-3কেজি
3. পেঁয়াজ-1 কেজি
4. মসুর ডাল- 500 গ্রাম
5. সোয়াবিন - এক প্যাকেট
6. বিস্কুট - দু প্যাকেট
7.এছাড়া প্রত্যেক পরিবারকে একটি করে সাবান ।
এই কাজটা মুখে বলা যতটা সহজ কাজে সফল করা ততোটা সোজা ছিল না। কিন্তু সেই মুশকিল কাজটা করেছে আমাদের ধলসা ক্লাবের যুবকবৃন্দ। মানুষ জানে শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকাই বেঁচে থাকা নয় ,অসহায় মানুষের পাশে বিপদ মুহূর্তে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার নামই সমাজবদ্ধ বাঁচা। ইতিহাস সাক্ষী আছে মানুষের পাশে আস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে তারাই আসলে মানবতার কারিগর। সেই আস্থার পথ মসৃণ ছিল না। কারণ আমাদের ক্লাবের ফান্ডে কোন টাকা ছিল না, দু'বছর আগে নতুন ক্লাব তৈরি করতে টাকা শেষ হয়ে গেয়েছিল, ক্লাবের দেওয়ালের গায়ে রঙটাও এখনো লাগেনি। যাইহোক এ ব্যাপারে কোন সরকারি অনুদান-সাহায্য পেয়েছি তাও নয়। কিন্তু কথায় আছে না ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। আর সেই উপায়টা প্রয়োজন ছিল এই দুর্যোগ মুহূর্তে, মাসব্যাপী লকডাউনের করাল গ্রাসে গ্রামের গরিব মানুষের সাহায্যার্থে হাত বাড়ানো। গ্রামের এই সামাজিক দায়িত্ববোধ এড়িয়ে শুধু ফেসবুকে সচেতনতা পাঠ দিতে পারি না। তাই একটু সময় নিয়ে ক্লাবের কয়েকজন মিলে উদ্যোগটা নিয়ে প্রথমে একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করি। করোনা ভয়কে দূরে রেখে গ্রামের সমস্ত যুব সদস্যরা আহ্বানে সাড়া দিয়ে কাজে নেমে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়া মারফত খবর পেয়ে বাইরে থাকা গ্রামের চাকরিজীবী মানুষও শেড়কের আহবানে সাড়া দিয়ে গ্রামের অসহায় মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
গ্রামের পাড়া অনুযায়ী এক এক সদস্যকে দুস্থ অসহায় পরিবার খোঁজার তালিকা তৈরি করার দায়িত্ব দেয়া হলো যাতে কেউ বাদ না যায়। এভাবে অনুসন্ধান করে পাওয়া গেল প্রায় 225 টি পরিবার, এরমধ্যে আদিবাসী পাড়ার সমস্ত পরিবারকে দেওয়ার প্রস্তাব হলো। আর একটা প্রস্তাব হলো পার্শ্ববর্তী পানিয়া গ্রামের দুস্থ মানুষের জন্যেও ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া। পুরো গ্রাম কালেকশন না করেই ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে থেকে ও বাইরে থাকা গ্রামের চাকরিজীবী মানুষজন হাত বাড়িয়ে দিলেন। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি বন্ধু মারফত অনেক বাইরের হিতাকাঙ্খী মানুষ অনলাইন ট্রানজাকশন এর দৌলতে আমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। মাত্র 4 দিনেই আমাদের প্রায় 60270 টাকা কালেকশন হলো। তা দিয়েই কেনা হল 10 কুইন্টাল চাল, 8 কুইন্টাল 7 কেজি আলু , 2.50 কুইন্টাল পেঁয়াজ , 1 কুইন্টাল 23 কেজি মসুর ডাল, পরিমাণ মত সোয়াবিন, বিস্কুট এবং 245 টি ডেটল সাবান।
আর্ত-মানবতার আহ্বানে সাড়া দিতে পেরে সবারই চোখে মুখে যেন মানসিক প্রশান্তির সুখ এ এক পরম প্রাপ্তি। ক্লাবের তরুণ যুবরা চাইছে এভাবেই যেন সারাবছর ক্লাবের সামাজিক দায়িত্ব ধারাবাহিকতায় বহাল থাকে।
"আমরা কাজকে করি না ভয় / মানবতাকে করি জয় " এ স্লোগানেই উদ্বুদ্ধ, এ যেন পরস্পরে বেঁধে বেঁধে থাকার অঙ্গীকার। আমরা যেন জয় করতে পারি সব রকম সংকীর্ণতা, বলতে পারি সকলের তরে সকলে আমরা ।।
# ধন্যবাদ জানাই উদ্যোক্তাদের এবং সকল ক্লাব সদস্য সহযোদ্ধাদের 🤝🤝🙏🙏
# আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই বাইরের সকল সহৃদয় ব্যক্তি / হিতাকাঙ্খী চাকুরীজীবি এবং মাস্টার মশাইদের, আপনাদের পাশে পাওয়া এক অনন্য প্রাপ্তি। 🤝🤝❤️🙏🙏